২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকায় গাড়ির গতি হাঁটার চেয়েও কমে যেতে পারে


নিজস্ব প্রতিবেদক | Updated News
প্রকাশের তারিখ: ১৮ আগস্ট ২০২৬

রাজধানী ঢাকার যানজট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ৪ কিলোমিটারে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ তখন রাজধানীতে যানবাহনের গতি মানুষের স্বাভাবিক হাঁটার গতির চেয়েও কম হতে পারে।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট ২০২৬) রাজধানীর বাংলামোটরে বিআইপি কনফারেন্স হলে আয়োজিত ‘ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা: চ্যালেঞ্জ ও পরিকল্পিত সমাধানের পথরেখা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। (Prothom Alo)

যানজটে বছরে বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট

বিআইপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর যানজটের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংগঠনটি বলছে, যানজট শুধু মানুষের কর্মঘণ্টাই নষ্ট করছে না; এর সঙ্গে জ্বালানি খরচ, বায়ুদূষণ, মানসিক চাপ এবং নগরজীবনের সামগ্রিক মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

একসময় গড় গতি ছিল ৭ কিলোমিটার

বিআইপির উপস্থাপিত প্রবন্ধে বিশ্বব্যাংকের ২০১৭ সালের একটি সমীক্ষার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছিল, ওই সময়ে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৭ কিলোমিটার।

বর্তমান পরিস্থিতি ও নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সমস্যা বিবেচনায় ভবিষ্যতে এই গতি আরও কমে ২০৩৫ সালে ঘণ্টায় প্রায় ৪ কিলোমিটারে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিআইপি। (Prothom Alo)

ঢাকার ৫৬টি খালের মধ্যে ২৬টির অস্তিত্ব নেই

শুধু যানজট নয়, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়েও প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বিআইপি জানিয়েছে, রাজধানীর ৫৬টি খালের মধ্যে ২৬টির কোনো অস্তিত্বই এখন নেই। সংগঠনটির মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতার মূল সমস্যা শুধু অতিবৃষ্টি নয়; বরং অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও এর বড় কারণ।

রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্নভাবে তৈরি হওয়ায় পুরো শহরকে একটি সমন্বিত পানি নিষ্কাশন নেটওয়ার্ক হিসেবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বায়ুদূষণের বড় উৎস ইটভাটা, ধুলা ও যানবাহন

বিআইপির প্রতিবেদনে ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার বায়ুদূষণের প্রায় ৮৫ শতাংশের জন্য ইটভাটা, রাস্তার ধুলা ও যানবাহনের ধোঁয়া দায়ী।

এর ফলে রাজধানীর মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অতিরিক্ত জনঘনত্বের কারণে নগরের পরিবেশগত ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে।

প্রতিদিনের বর্জ্যের বড় অংশ ব্যবস্থাপনার বাইরে

রাজধানীতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়মিতভাবে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

বিআইপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন উৎপন্ন বর্জ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার বাইরে থাকে। এর ফলে পরিবেশদূষণ, জলাবদ্ধতা এবং মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। (Prothom Alo)

গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ

প্রতিবেদনে গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও উঠে এসেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ঢাকায় গণপরিবহনে চলাচলের সময় প্রায় ৮৭ শতাংশ নারী হয়রানির শঙ্কায় থাকেন।

এ ছাড়া বর্তমান গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রবীণ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবহারবান্ধব নয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

খেলার মাঠও কমে যাচ্ছে

অপরিকল্পিত আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের কারণে রাজধানীতে শিশুদের খেলার মাঠের সংকট বাড়ছে। খালি জায়গাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা গড়ে ওঠায় শিশু ও তরুণদের জন্য উন্মুক্ত জায়গা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার অনেক খেলার মাঠ বাণিজ্যিকীকরণের কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। (Prothom Alo)

ঢাকার বাসযোগ্যতা উন্নয়নে ৭ দফা সুপারিশ

ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিআইপি সাত দফা সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও চলমান নগর পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।

  • ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক স্বার্থে পরিকল্পনার মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন না করা।

  • প্রতি পাঁচ বছর পরপর নগর পরিকল্পনার অগ্রগতি ও প্রতিবন্ধকতা পর্যালোচনা করা।

  • সমন্বিত জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা।

  • উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের আগে বাধ্যতামূলক ‘পরিকল্পনা সামঞ্জস্য প্রতিবেদন’ গ্রহণ করা।

  • বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিচালনা করা।

  • জলাভূমি, খাল, নদী ও উন্মুক্ত স্থান রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। (Prothom Alo)

পরিকল্পনাবিদদের সতর্কবার্তা

বিআইপির সভাপতি মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা স্বাধীনতার পরপরই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এত বছর পরও সেটি পুরোপুরি প্রণীত হয়নি। তাঁর মতে, সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তার ভিত্তিতে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে ঢাকার বাসযোগ্যতা নিয়ে ভবিষ্যতের সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।

নগর-পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন ও খেলার মাঠের সংকট—এসব আলাদা কোনো সমস্যা নয়। এগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া রাজধানীর বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা কঠিন।

No comments:

Post a Comment

 

চাকরির খবর + চাকরির প্রস্তুতির জন্য সাম্প্রতিক পরীক্ষার প্রশ্ন ও সমাধান পেতে আমাদের সাথে থাকুন।